কেন্দুয়ায় বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, হাসপাতালে ভর্তি ৩৪ জন
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর থেকে গ্রামে ফেরা তরুণদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়েও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা না করানো এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র তিনজনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তবে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন করে আরও ২০ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭৯ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জনের ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আক্রান্তদের অধিকাংশই তরুণ। তাদের অনেকেই কর্মস্থল ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে সম্প্রতি কেন্দুয়ায় ফিরেছেন। বাইরে থেকে আসা এসব ব্যক্তির মাধ্যমেই স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এখনো পৃথক কোনো শয্যা বা সুনির্দিষ্ট আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়নি। ফলে সাধারণ ওয়ার্ডেই অন্যান্য রোগীর সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কিংবা স্বজনদের আগ্রহে অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
শুক্রবার ও শনিবার (১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চারজন ডেঙ্গু রোগীকে ভর্তি অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তাদের একজনকে ওই দিনই ছাড়পত্র দেওয়ার কথা ছিল। ভর্তি রোগীদের মধ্যে রয়েছেন নিলাম্বরখিলা গ্রামের একরামুল (৩১), জালালপুর গ্রামের লিমন (২০) এবং কচন্দারা গ্রামের সাকায়াতুল (৬)। এছাড়া কোনাপাড়া গ্রামের জহিরুল ইসলামের ছেলে সাঈদ হোসেন (৯) নামে এক শিশুকে শনিবার উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
তবে হাসপাতালের খাতাপত্রের হিসাবের তুলনায় বাস্তবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, জ্বর, শরীর ব্যথাসহ ডেঙ্গুর বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন। তাদের একটি অংশ ডেঙ্গু পরীক্ষা না করিয়েই কিংবা হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। ফলে উপজেলায় ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাঈম হাসান জানান, রোগীর জ্বর বা উপসর্গ শুরুর সময় বিবেচনা করে এনএস১ (NS1), আইজিএম (IgM), আইজিজি (IgG) ও সিবিসি (CBC) পরীক্ষা করা হচ্ছে। কেন্দুয়ার বাইরের অনেক রোগী ডেঙ্গু পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়ার পর ফোন করে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হতে চান বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের রোগীর চাপ থাকে। এর মধ্যে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের কারণে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
ডা. নাঈম হাসান বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর প্লাটিলেট দ্রুত কমে যেতে পারে। তাই জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সচেতন করতে ইতোমধ্যে একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আশপাশে ফুলের টব, পুরোনো বোতল, কৌটা, ডাবের খোসা কিংবা অন্য কোনো পাত্রে যেন বৃষ্টির পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।”
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ২৩ হাজার ৫০০ ট্যাপেন্টাডলসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার
দুর্জয় বাংলা