শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

বাউল সালাম সরকার: দুই হাজারের বেশি গান, তবু নেই সরকারি স্বীকৃতি

প্রকাশিত: ১২:২৩, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাউল সালাম সরকার: দুই হাজারের বেশি গান, তবু নেই সরকারি স্বীকৃতি

বাউল সালাম সরকার: দুই হাজারের বেশি গান, তবু নেই সরকারি স্বীকৃতি

‘জীবন মানেই তো যন্ত্রণা, বেঁচে থাকতে বোধ হয় শেষ হবে না’—জীবনের এমন কঠিন বাস্তবতাই তার গানের কথায় উঠে আসে। কখনো প্রেম-বিরহ, কখনো মানুষের সুখ-দুঃখ, কখনো আধ্যাত্মিকতা, আবার কখনো গ্রামীণ জীবনের নানা টানাপোড়েন—সবকিছুই তার গানের উপজীব্য।

তিনি বাউল কবি সালাম সরকার। কিশোর বয়স থেকেই গান লেখা ও গাওয়ার সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পী তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংগীতসাধনা করে আসছেন। তার দাবি, এ দীর্ঘ সময়ে তার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে দুই হাজারেরও বেশি গান। তার লেখা বহু গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছে। বাজারে রয়েছে তার বেশ কিছু অডিও ক্যাসেটও।

শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনার কেন্দুয়ার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিজ বাড়িতে কথা হয় বাউল সালাম সরকারের সঙ্গে। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। চারপাশের ব্যস্ততাও কমে এসেছিল। সেই নীরব পরিবেশেই কাগজ-কলম নিয়ে বসে ছিলেন প্রবীণ এই বাউল কবি। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় দেয় না। হাতেও এসেছে ক্লান্তি। সংসারের অভাব-অনটন ও জীবনের নানা টানাপোড়েন রয়েছে। তারপরও থেমে নেই তার কলম। কখনো কাগজের পাতায় শব্দ সাজান, কখনো সেই শব্দে সুর বসান, আবার কখনো নিজেই মিউজিক করেন। সুযোগ পেলেই আনমনে গেয়ে ওঠেন নিজেরই লেখা গান। মনে হয়, বয়স তার শরীরকে ছুঁয়েছে; কিন্তু গানকে ছুঁতে পারেনি।

কিশোর বয়স থেকেই গানের সাধনা:
বাউল সালাম সরকার ১৯৬৭ সালের ৪ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মভূমি মদন হলেও জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে কেন্দুয়ায়। কিশোর বয়স থেকেই কেন্দুয়াকে তিনি গানের সাধনস্থল হিসেবে বেছে নেন।

এখানেই স্ত্রী সামছুন্নাহারের সঙ্গে সংসার পেতেছেন। স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে জীবনের বড় একটি অধ্যায় কেটেছে তার। সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, বিনোদনের ধরন এবং গান শোনার মাধ্যম। কিন্তু সালাম সরকারের গানের জগৎ বদলায়নি। এখনো তার চিন্তা-ভাবনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে গান, বিশেষ করে লোকসংগীত ও বাউলগান।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লিখে চলেছেন বাউলগান ও লোকগান। তার গানে উঠে এসেছে মানুষের খুব পরিচিত জীবনকথা। প্রেমের আকুলতা, বিচ্ছেদের বেদনা, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, পারিবারিক সম্পর্ক, সমাজের বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিক ভাবনা—সবকিছুই জায়গা পেয়েছে তার সৃষ্টিতে।

মানুষের মনের কথাই বলেন গানে:
‘কি সুন্দর এক গানের পাখি, মন নিয়ে সে খেলা করে’, ‘আমি পারি না আর পারি না, আমি কেন মরি না, আজরাইল কি আমারে চিনে না’ কিংবা ‘গানই আমার জীবন রে বন্ধু, গানই আমার জীবন’—এমন জীবনঘনিষ্ঠ কথায় তার গানের স্বাতন্ত্র্য ফুটে ওঠে।

তার গানের ভাষা সহজ-সরল। তাই গ্রামের সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তার গানের সঙ্গে নিজেদের জীবন ও অনুভূতির মিল খুঁজে পান। তার গানের কথা, সুর, লয় ও তালে রয়েছে মাটির মানুষের জীবনের স্পন্দন। মানুষের মনের অব্যক্ত কথাগুলোকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করাই যেন তার সৃষ্টির বড় শক্তি। এ কারণে তার গান শুধু মঞ্চে আটকে থাকেনি। শিল্পীর কণ্ঠ পেরিয়ে পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের কাছে। পথে-ঘাটে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কণ্ঠে শোনা যায় তার গান। দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান ও নবীন শিল্পী তার গান গেয়েছেন বলে জানান তিনি। দেশের বাইরের শিল্পীরাও তার গান পরিবেশন করেছেন।

দুই হাজারের বেশি গান, তবু নেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:
দীর্ঘ সংগীতজীবনে দুই হাজারের বেশি গান লিখলেও এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি বাউল কবি সালাম সরকার। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা এখনো তার নাগালের বাইরে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা লোকসংগীত ও বাউলগানে অবদান রেখে চলা এই শিল্পীর এমন অবস্থায় আক্ষেপ রয়েছে তার ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে। স্থানীয়দের দাবি, জনপ্রিয়তা কিংবা পরিচিতির বিচারে নয়, সালাম সরকারের দীর্ঘ সংগীতসাধনা ও সৃষ্টিকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হলেও রাষ্ট্র যেন এই প্রবীণ বাউল কবির অবদানের স্বীকৃতি দেয়—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

পুরস্কারের আশায় গান করেননি:
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুললে সালাম সরকারের কণ্ঠে কোনো ক্ষোভ শোনা যায় না। বরং রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার শান্ত স্বর। তিনি বলেন, জীবনে ভক্তদের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার জন্যই হয়তো এখনো বেঁচে আছি। এখনো গান লিখছি এবং গাইছি। নতুন নতুন আরও গান উপহার দেওয়ার চেষ্টা করছি। যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গান লিখে ও গেয়ে যেতে পারি—সবার কাছে এই দোয়া চাই।”

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, “পুরস্কার বা সম্মাননার আশায় গান করিনি। গান আমার জীবন। জীবনের তাগিদেই গান করি। তবে সরকার যদি আমাকে যোগ্য মনে করে, তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে। আমি সেই অপেক্ষাতেই আছি।” তার এই অপেক্ষা কত দীর্ঘ হবে, তার উত্তর অবশ্য কারও জানা নেই।

অভাব-অনটনেও থামেনি গান:
জীবনের বর্তমান বাস্তবতা খুব সহজ নয়। বয়স বেড়েছে, সংসারের প্রয়োজনও বেড়েছে। স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে জীবনের শেষভাগে এসে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে তাকে। তারপরও গান ছাড়েননি। একসময় যে কণ্ঠে প্রতিনিয়ত নতুন গানের সুর জন্ম নিত, বয়সের ভারে আজ সেই কণ্ঠ কিছুটা ধীর। শরীর ক্লান্ত, বিশ্রাম চায়। কিন্তু মনের ভেতর গান এখনো জেগে আছে। তাই সুযোগ পেলেই কাগজ-কলম নিয়ে বসেন তিনি। নতুন গান লেখেন, সুর করেন। তার কাছে গান কোনো খ্যাতির সিঁড়ি নয়; বরং বেঁচে থাকার প্রেরণা। দুই হাজারের বেশি গান লেখার পরও নতুন গানের জন্য তার ভেতরে শব্দেরা ভিড় করে, সুরেরা হাতছানি দেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে ক্লান্ত করেছে, কিন্তু থামাতে পারেনি।

জীবনের পড়ন্ত বিকেলেও গানের পাখি:
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাকে এখনো ছুঁয়ে যায়নি। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা তার সবচেয়ে বড় পাথেয়। সালাম সরকারের গল্প তাই শুধু একজন বাউল কবির গল্প নয়; এটি একজন সৃষ্টিশীল মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। অভাব তাকে ক্লান্ত করেছে, বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু গানকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি। কেন্দুয়ার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার সাদামাটা ঘরে আজও কখনো কাগজে শব্দ নামে, কখনো সুর ভেসে ওঠে। হয়তো কোনো একদিন সেই সুর পৌঁছে যাবে রাষ্ট্রের দরজাতেও। ততদিন পর্যন্ত নিজের ঘরে বসেই গান লিখে যাবেন সালাম সরকার। গান থামেনি তার; শুধু বদলে গেছে জীবনের সুর। আর ভক্তদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকতে চান—একজন গানের পাখি হয়ে।

আরও পড়ুন: নেত্রকোণার লোকসাহিত্য ও প্রবন্ধসাহিত্য

দুর্জয় বাংলা


Warning: Undefined variable $sAddThis in /home/durjoyba/durjoybangla.com.bd/details.php on line 871