জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাতিসংঘে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যা এই পরিবারের ধারাবাহিকতায় বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য মাইলফলক। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন নিউইয়র্কে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে, বিশ্বসভায় দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলা ভাষাকেই বেছে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্বমঞ্চে বাংলা ভাষার এই মর্যাদাপূর্ণ উপস্থাপন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্ত হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। দিনের শুরুতে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মূলত স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্মার্ট ফার্মার কার্ড চালুর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে দেশে নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়, যার বড় একটি অংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এসব উদ্যোগে গেটস ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া মিলেছে এবং খুব শীঘ্রই তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে।
এছাড়াও জাতিসংঘে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইডলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বিশ্ববাসীর সামনে পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। অতীতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এবারও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মানবিক সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়ানোর জোর দাবি জানান তিনি। গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সংকট সমাধানে পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
দিনজুড়ে চলা অন্যান্য কূটনৈতিক কার্যক্রমেও নানা সাফল্যের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র। পূর্ব ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিবেশ সুরক্ষায় নদী খনন, বৃক্ষরোপণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। সব মিলিয়ে এই সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল একটি অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।