শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

নেত্রকোণার লোকসাহিত্য ও প্রবন্ধসাহিত্য

ওয়াসীম আহমেদ

প্রকাশিত: ১০:২৬, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেত্রকোণার লোকসাহিত্য ও প্রবন্ধসাহিত্য

নেত্রকোণার লোকসাহিত্য ও প্রবন্ধসাহিত্য

লোকসাহিত্য হলো মৌখিক ধারার সাহিত্য, যা অতীতের ঐতিহ্য, লোকজ বিশ্বাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান জীবনের নানা উপলব্ধিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে বসবাসকারী মানুষের সমন্বিত সমাজমানস থেকেই এর উদ্ভব। সাধারণত অক্ষরজ্ঞানহীন কিংবা স্বল্পশিক্ষিত পল্লিবাসীর স্মৃতি ও শ্রুতির ওপর নির্ভর করেই লোকসাহিত্যের লালন ও বিকাশ ঘটে। মূলত কোনো ব্যক্তিবিশেষের রচনা হলেও সমষ্টির চর্চা, সংযোজন ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে তা ক্রমে পরিপক্বতা লাভ করে। ফলে লোকসাহিত্য একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, আবেগ, চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

বিষয়, ভাষা ও প্রকাশরীতির ক্ষেত্রে লোকসাহিত্যে প্রচলিত ধারাই প্রধানত অনুসৃত হয়। এতে হয়তো আধুনিক সাহিত্যের মতো পরিশীলিত চিন্তার প্রকাশ সবসময় দেখা যায় না; কিন্তু কল্পনা, আবেগ, জীবনবোধ ও অভিজ্ঞতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ একে অনন্য শিল্পসৌন্দর্য দান করেছে। রস, আনন্দ ও মানবিক অনুভূতির গভীরতা লোকসাহিত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

লোকসাহিত্য মূলত লোকসংস্কৃতির একটি জীবন্ত ধারা। এর মধ্য দিয়ে একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর হৃদয়ের স্পন্দন, জীবনযাপন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুখ-দুঃখের কথা জানা যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লোকসাহিত্যকে ‘জনপদের হৃদয়-কলরব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাধারণভাবে লোকসাহিত্যকে আটটি প্রধান শাখায় ভাগ করা যায়—লোকসঙ্গীত, গীতিকা, লোককাহিনি, লোকনাট্য, ছড়া, মন্ত্র, ধাঁধা ও প্রবাদ।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য:
বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যচর্চার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বৈচিত্র্যময় ও গৌরবময়। বিশেষ করে এখানকার পালাগান বাংলা লোকসাহিত্যের ভাণ্ডারে এক অনন্য সংযোজন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’।

বাংলায় ফোকলোরচর্চার ইতিহাস প্রায় দুইশ বছরের বলে অনেক গবেষক মনে করেন। তবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ফোকলোরচর্চার সূচনা ঠিক কখন থেকে—তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস এখনও সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি। বিভিন্ন গবেষক ও লোকসাহিত্যবিদের মতে, কাহ্নপা থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলের বহু কবি, গীতিকার, বাউল, পুঁথিকার ও লোকশিল্পী লোকসাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

নেপালের রাজদরবারে চর্যাপদ আবিষ্কারের পর বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস নতুনভাবে আলোচিত হয়। কাহ্নপার জন্মস্থান বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার আটপাড়া অঞ্চলে—এমন একটি ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। আনুমানিক দশম শতকের এই কবিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যচর্চার ইতিহাসকে অনেকটাই প্রাচীন বলে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে কবি কঙ্কসহ বিভিন্ন লোককবি ও পালাকার এ অঞ্চলের লোকসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের উল্লেখযোগ্য লোকসাহিত্যিক শতাব্দী ও দশক বিবেচনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য লোকসাহিত্যিকের নাম ও তাঁদের অবদান সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায়।

কাহ্নপা:
কাহ্নপা আনুমানিক দশম শতকের কবি এবং চর্যাপদের অন্যতম রচয়িতা। তাঁর নামের সঙ্গে ‘কাহ্নপা গীতিকা’-র উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলা ভাষা ও লোকজ সাহিত্যধারার প্রাচীন বিকাশে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্ণানন্দ গীরিরাজ পরমহংস ও কবি কঙ্ক:
পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের সঙ্গে যুক্ত কবি কঙ্ক বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যচর্চার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাম। বারমাসী, পালাগান ও পাঁচালী রচনায় তাঁর অবদান স্মরণীয়। ‘মলুয়ার বারমাসী’, ‘বিদ্যাসুন্দর’ এবং ‘কঙ্ক ও লীলা’ তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য রচনা। ড. দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত মৈমনসিংহ গীতিকা-তেও এ ধরনের পালাগানের গুরুত্ব রয়েছে।

নয়ন চাঁদ:

সপ্তদশ শতকের লোককবি নয়ন চাঁদ মৈমনসিংহ গীতিকা-র অন্যতম পালাগান রচয়িতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর রচনায় সমকালীন লোকজ জীবন ও মানুষের আবেগের প্রতিফলন দেখা যায়।

বরকত সরকার:
বরকত সরকার (১৭৩২–১৮১০) ছিলেন একজন পুঁথিলেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘ইমাম সাগরের পুঁথি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মনসুর বয়াতী:
সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের প্রখ্যাত লোককবি ও পালাগান রচয়িতা মনসুর বয়াতীর সবচেয়ে পরিচিত পালাগান ‘দেওয়ানা মদিনা’। লোকসাহিত্য সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে হবিগঞ্জের বানিয়াচং অঞ্চল থেকে এই পালাগান সংগ্রহ করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

দ্বিজ কানাই:
সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত লোককবি দ্বিজ কানাই ‘নদের চাঁদ’ ও ‘মহুয়া’ পালার রচয়িতা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর রচনার সরলতা, আবেগ ও মানবিকতার বিশেষ প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, পালাগানগুলোর রচনাকাল সপ্তদশ শতকের।

শ্যামচাঁদ গুপ্ত:
শ্যামচাঁদ গুপ্ত (১৭৭৪–১৮৫৪) ছিলেন সারিগানের রচয়িতা ও সংগ্রাহক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘সারিগান’। লোকসংগীতের সংরক্ষণ ও প্রচারে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

হারাধন বাগচী:
সপ্তদশ শতকের হারাধন বাগচী ছিলেন সারিগানের রচয়িতা। তিনি অসংখ্য ছড়া ও সারিগান রচনা করেছেন বলে জানা যায়।

রাজা রাজসিংহ:
রাজা রাজসিংহ (১৭৫০–১৮২১) ছিলেন একজন গীতিকবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ‘রাগমালা’ ও ‘মনসার পাঁচালী’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

নেত্রকোণার প্রবন্ধসাহিত্য:
প্রবন্ধসাহিত্যের প্রধান শক্তি হলো তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ব্যবহার। যেহেতু প্রবন্ধসাহিত্য অনেকাংশে গবেষণাধর্মী, তাই এ ধরনের সাহিত্যচর্চায় গভীর অধ্যয়ন, অনুসন্ধান ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। এ কারণে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় নেত্রকোণা জেলায় প্রাবন্ধিকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অনেক লেখক নিয়মিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখলেও তাঁদের সবার পৃথক প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তবুও এ জেলার প্রবন্ধসাহিত্যের ঐতিহ্য ও অবদান কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।

নাট্যসাহিত্য ও কথাসাহিত্যের তুলনায় নেত্রকোণার প্রবন্ধসাহিত্যের বিকাশ হয়তো কিছুটা কম দৃশ্যমান; কিন্তু বিষয়বৈচিত্র্য, রচনাশৈলী, তথ্যনির্ভরতা ও চিন্তার গভীরতার দিক থেকে এ অঞ্চলের প্রবন্ধসাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ। প্রাবন্ধিকের সংখ্যা সীমিত হলেও তাঁদের রচনায় ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, লোকঐতিহ্য ও সমকালীন নানা বিষয় উঠে এসেছে।

সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সৃজনশীলতা। নেত্রকোণার প্রাবন্ধিকেরা তথ্য ও উপাত্তকে শুধু উপস্থাপন করেননি; বরং সেগুলোকে বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও যুক্তির মাধ্যমে নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করেছেন। তাঁদের প্রবন্ধে প্রবন্ধ ও নিবন্ধের পার্থক্যও অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রাবন্ধিকের সংখ্যা কম হলেও নিবন্ধকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও গবেষণামুখী প্রাবন্ধিকের আবির্ভাব ঘটবে—এ প্রত্যাশা অমূলক নয়।

নেত্রকোণার প্রবন্ধসাহিত্যের পথিকৃৎ:
নেত্রকোণা জেলার প্রবন্ধসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের বহু লেখকের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—বিজয় আচার্য, কমলকৃষ্ণ সিংহ, যোগেন্দ্রচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, মনোরঞ্জন মহোদয়, অধ্যাপক সামছুদ্দিন আহমেদ, খোরশেদ আলী তালুকদার, আবদুল হাই, এ.এফ.এম. শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক নূরুল হক, মৌলানা ফজলুর রহমান খান, মো. নূরুল আমীন, নূরুল ইসলাম কাসিমপুরী, চন্দ্রকুমার দে, রওশন ইয়াজদানী ও সিরাজ উদ্দিন কাসিমপুরী প্রমুখ। তাঁদের সাহিত্যচর্চা ও প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে নেত্রকোণার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ ও সংস্কৃতি বাংলা সাহিত্যভুবনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

সমকালীন প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক:
বর্তমান নেত্রকোণার প্রবন্ধসাহিত্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখক তাঁদের চিন্তা ও মননশীল রচনার মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক যতীন সরকার, প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান, খগেশ কিরণ তালুকদার, প্রয়াত সন্তোষ সরকার, অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার, আলী আহম্মদ খান আইয়ূব, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আহম্মদ খান এফসিএ, রফিকুল ইসলাম আপেল, অধ্যাপক বিধান মিত্র, প্রফেসর ননী গোপাল সরকার, অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, নূরুল ইসলাম, স্বপন পাল, সঞ্জয় সরকার, হামিদুর রহমান, আবদুল লতিফ ও ইকবাল হাসান তপু প্রমুখ। তাঁরা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস ও সমকালীন নানা বিষয় নিয়ে লিখে চলেছেন। তাঁদের লেখার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম নেত্রকোণার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে নতুনভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছে।

অধ্যাপক যতীন সরকারের প্রবন্ধসাহিত্য:
নেত্রকোণার প্রবন্ধসাহিত্যের আলোচনায় অধ্যাপক যতীন সরকারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধু একজন প্রাবন্ধিক নন; তিনি একজন সমাজচিন্তক ও মননশীল সাহিত্যবিশ্লেষক। তাঁর লেখায় সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন ও রাজনীতির নানা দিক গভীরভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে।

১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমি পত্রিকায় তাঁর ‘পাকিস্তানোত্তর পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’ শিরোনামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির জন্য তিনি ডক্টর এনামুল হক সাহিত্যপদক লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের উপন্যাস নিয়ে গবেষণাকারী দেশ-বিদেশের অনেক গবেষক এ প্রবন্ধটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন।

অধ্যাপক যতীন সরকার তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, সময়ের ব্যবধানে উপন্যাস সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মতামতের অনেক পরিবর্তন ঘটলেও প্রবন্ধটিকে নির্বাচিত সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করার সময় তিনি মূল লেখাটি অপরিবর্তিত রাখাকেই সমীচীন মনে করেছেন।

তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ গ্রন্থে বিভিন্ন সময়ের চারটি গ্রন্থ থেকে প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থগুলো হলো—

১. সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা (১৯৮৫)
২. বাঙালি সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য (১৯৮৭)
৩. দ্বি-জাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞানচেতনা (২০০৬)
৪. সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী সমাচার (২০০৭)

তাঁর নির্বাচিত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘পাকিস্তানোত্তর পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’, ‘মানবজমিন রইলো পতিত’, ‘কথক শরৎচন্দ্র’, ‘তাঁর কথা সরিৎসাগর’, ‘ইকবাল আহমদ’, ‘ইতিহাস ব্যাখ্যায় সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও সাহিত্য’, ‘পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ও সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, ‘বাঙালির লৌকিক ঐতিহ্যে সমাজতান্ত্রিক উপাদান’, ‘আমি দ্বি-জাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করি’, ‘আমি অ-দৃষ্টে বিশ্বাসী’, ‘নিয়তিবাদ এবং বিজ্ঞান সচেতন’, ‘চেতনার বিজ্ঞান’, ‘মার্কসবাদের খণ্ডীভবন ও সমাজতন্ত্রের সংকট’, ‘কেবল মুসলমানের লাগিয়া আসেনি কো ইসলাম’, ‘বাঙালির মানুষ হওয়া’, ‘কমল হীরের পাথর চাই’, ‘সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে লৌকিক ঐতিহ্য’, ‘বাংলার লোকসমাজে পুরুষতন্ত্র ও নারীচেতনা’ এবং ‘সুশীল সমাজ মানে ব্রাহ্মণ সমাজ’ প্রভৃতি।

তাঁর প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য হলো—ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিকে তিনি পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে দেখেননি; বরং একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে তাঁর রচনায় সাহিত্যচিন্তার পাশাপাশি সমাজচিন্তা ও ইতিহাসবোধের গভীর সমন্বয় লক্ষ করা যায়। 

‘পশ্চাতের আমি’ ও নিয়তির ধারণা
অধ্যাপক যতীন সরকার তাঁর একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ভাবনাকে তুলে ধরেছেন—

‘অদৃষ্টেরে শুধালেম, চিরদিন পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?
সে কহিল, ফিরে দেখো, দেখিলাম থামি
সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।’

এখানে ‘পশ্চাতের আমি’ কেবল ব্যক্তিমানুষের অতীত সত্তাকে বোঝায় না; এর সঙ্গে প্রকৃতি ও প্রকৃতি-উদ্ভূত মানুষের বিকাশের ধারাবাহিকতাও যুক্ত। প্রকৃতি ও মানুষের বিকাশ একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে ঘটে এবং সেই ধারাবাহিকতার নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। এই নিয়মকেই ‘নিয়তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আবার প্রকৃতির এই ধারাবাহিক পরিবর্তন ও দ্বন্দ্বের মধ্যেই সামাজিক পরিবর্তনেরও অন্তর্নিহিত সূত্র নিহিত রয়েছে। অধ্যাপক যতীন সরকারের এ ধরনের চিন্তা ও বিশ্লেষণ নেত্রকোণার প্রবন্ধসাহিত্যকে শুধু সাহিত্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তা সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধের গভীর বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

আরও পড়ুন: বিরহী বাউল উকিল মুন্সি

দুর্জয় বাংলা


Warning: Undefined variable $sAddThis in /home/durjoyba/durjoybangla.com.bd/details.php on line 871